যেদিন বুয়েটের দরজা খুলেছিল নারীদের জন্য

তিন তরুণীর সাহসী লড়াইয়ে ১৯৬৪ সালে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষায় নারীর নতুন অধ্যায়

যেদিন বুয়েটের দরজা খুলেছিল নারীদের জন্য
১৯৬০-এর দশকের ইপুয়েটের ঐতিহাসিক ক্যাম্পাস/তৎকালীন নারী প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের ছবি। প্রকৌশল শিক্ষায় নারীর পথচলার সূচনালগ্ন—খালেদা শাহরিয়ার কবির, মনোয়ারা বেগম ও শিরীন সুলতানার সাহসী পদক্ষেপ বদলে দিয়েছিল ইতিহাস। -অনুসন্ধানবার্তা

হেলাল সরকারঃ কানাডা প্রতিনিধি: প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিন তরুণী দাঁড়িয়েছিলেন এমন একটি প্রতিষ্ঠানের দরজায়, যেখানে তখন প্রকৌশলের বেশিরভাগ বিভাগে নারীদের প্রবেশের সুযোগই ছিল না। তাঁদের বলা হয়েছিল—প্রকৌশল, বিশেষ করে পুরকৌশল, মেয়েদের জন্য উপযুক্ত নয়।কিন্তু খালেদা শাহরিয়ার কবির, মনোয়ারা বেগম ও শিরীন সুলতানা সেই যুক্তি মেনে নেননি।তাঁদের প্রশ্ন ছিল—মেয়েরা প্রকৌশল পড়তে পারবে না, এমন নিষেধাজ্ঞা কোথায়? সেই প্রশ্ন এবং তাঁদের দৃঢ় অবস্থানই শেষ পর্যন্ত বদলে দেয় পরিস্থিতি। তিন তরুণী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ইতিহাসের অংশ হয়ে যান। তাঁদের হাত ধরেই তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি—ইপুয়েট, আজকের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে—প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষায় নারীর আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়।

স্বপ্নের পথে প্রথম বাধা

খালেদা শাহরিয়ার কবির ও শিরীন সুলতানা ছিলেন ইডেন কলেজের ছাত্রী। মনোয়ারা বেগম পড়তেন হলিক্রস কলেজে। তিনজনই প্রকৌশল শিক্ষায় আগ্রহী ছিলেন।কিন্তু তাঁদের সামনে প্রথম বাধা হয়ে দাঁড়ায় ইপুয়েটের তৎকালীন ভর্তি ব্যবস্থা। স্থাপত্য বিভাগে নারী শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পেলেও প্রকৌশলের অন্যান্য বিভাগে তাঁদের ভর্তি নেওয়া হতো না।বিশেষ করে পুরকৌশল নিয়ে আপত্তি ছিল বেশি। এই বিভাগে শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হতো। এমনকি সাভারে এক মাসের আবাসিক সার্ভে ক্যাম্পেও অংশ নিতে হতো। তৎকালীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় মেয়েদের জন্য এমন পরিবেশকে অনুপযুক্ত মনে করা হতো।কর্তৃপক্ষ তাঁদের নিরুৎসাহিত করলেও তিন তরুণী পিছু হটলেন না।তাঁরা যুক্তি দিলেন—নারী বলে প্রকৌশল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। অন্তত ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তাঁদের দিতে হবে।শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ তাঁদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।তিনজন ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন এবং সফলভাবে উত্তীর্ণ হন।

শেষ হয়নি লড়াই

ভর্তি হওয়ার পরও তাঁদের সংগ্রাম শেষ হয়নি।প্রথম বর্ষে সাধারণ প্রকৌশল বিষয় পড়ার পর দ্বিতীয় বর্ষে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিভাগ বেছে নিতে পারতেন। খালেদা শাহরিয়ার কবির ও শিরীন সুলতানা পুরকৌশল বেছে নিতে চাইলেন।কর্তৃপক্ষ আবারও আপত্তি তুলল।এবার দুই তরুণী তাঁদের পরিবারের সম্মতি নিয়ে কর্তৃপক্ষকে আশ্বস্ত করেন যে, প্রয়োজন হলে তাঁরা সাভারের আবাসিক সার্ভে ক্যাম্পেও অংশ নেবেন।শেষ পর্যন্ত তাঁদের পুরকৌশল পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়।মনোয়ারা বেগম বেছে নেন কেমিকৌশল।এভাবেই তাঁরা হয়ে ওঠেন ইপুয়েটের প্রকৌশল বিভাগের প্রথম নারী শিক্ষার্থী।

ক্যাম্পাসে তিন তরুণীকে ঘিরে কৌতূহল

তিন নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি সে সময় ক্যাম্পাসে ছিল একেবারেই নতুন ঘটনা। তাঁদের দেখতে এবং পরিচিত হতে অনেকেই আসতেন।পরবর্তী সময়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খালেদা শাহরিয়ার কবির বলেছিলেন, তাঁদের দেখতে মানুষের ভিড় লেগে যেত।আজকের দিনে বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার শুরুটা ছিল এমন এক সময়ে, যখন তিনজন নারীকে শুধু পড়াশোনার সুযোগ পাওয়ার জন্যই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছিল।

ইতিহাসের পাতায় প্রথম নারী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার

১৯৬৮ সালে খালেদা শাহরিয়ার কবির ও শিরীন সুলতানা পুরকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।এর মধ্য দিয়ে তাঁরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের প্রথম নারী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।সে বছর পুরকৌশল বিভাগে ১১৩ জনের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে তাঁরা ছিলেন দুই নারী।সমকালীন সংবাদপত্র Morning News তাঁদের সাফল্যকে গুরুত্ব দিয়ে লিখেছিল, পূর্ব পাকিস্তানের মেয়েদের জন্য তাঁরা একটি নতুন পেশার পথ খুলে দিয়েছেন।মনোয়ারা বেগমও তাঁর শিক্ষাজীবন সফলভাবে শেষ করেন এবং ১৯৭০ সালে কেমিকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে খালেদা শাহরিয়ারের আরেক ইতিহাস

খালেদা শাহরিয়ার কবিরের সংগ্রাম শুধু শিক্ষাজীবনেই সীমাবদ্ধ ছিল না।১৯৬৯ সালে তিনি একটি প্রকৌশল পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। ১৯৭০ সালে যোগ দেন তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান ওয়াটার অ্যান্ড পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট অথরিটিতে। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীকালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে রূপান্তরিত হয়।সেখানেও তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেন। পাকিস্তান সরকারের অধীনে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োগ পাওয়া প্রথম নারী প্রকৌশলী হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়।দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের দায়িত্বও পান।তিস্তা ব্যারাজসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পানি উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে তাঁর কর্মজীবনের সংশ্লিষ্টতা ছিল।২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

একটি প্রশ্ন, একটি নতুন অধ্যায়

আজ বুয়েটের করিডোরে নারী-পুরুষ পাশাপাশি হাঁটেন। শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি কিংবা প্রকৌশল গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণ আর কোনো বিস্ময়ের বিষয় নয়।কিন্তু কয়েক দশক আগে এই দৃশ্য কল্পনা করাও সহজ ছিল না।সেই বাস্তবতা বদলানোর প্রথম সারির মানুষদের মধ্যে ছিলেন খালেদা শাহরিয়ার কবির, মনোয়ারা বেগম ও শিরীন সুলতানা।তাঁরা শুধু নিজেদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেননি; তাঁদের সাহস পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্যও একটি দরজা খুলে দিয়েছিল।তাঁদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কোনো প্রতিষ্ঠান যখন বলে, ‘এখানে তোমাদের জায়গা নেই’, তখন প্রশ্ন করতে হয়—

‘কেন নেই?’

১৯৬৪ সালে তিন তরুণীর সেই প্রশ্নই বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার ইতিহাসে নারীর জন্য নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

বিভিন্ন মাধ্যমে সংগৃহীত। ঢাকা, ১৯৬৪।